on
Backlink
- Get link
- X
- Other Apps
বর্তমান যুগে ব্যবসা বা ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংয়ের কথা ভাবলেই সবার আগে যে নামটা মাথায় আসে, তা হলো ফেসবুক। বাংলাদেশে কোটি কোটি মানুষ এখন ফেসবুকে সক্রিয়। সাধারণত ফেসবুকে দুইভাবে মার্কেটিং করা যায়: ১) পেইড মার্কেটিং (টাকা খরচ করে বিজ্ঞাপন দেওয়া) এবং ২) ফ্রি বা অর্গানিক মার্কেটিং।
সবার পক্ষে শুরুতেই বিজ্ঞাপনের পেছনে হাজার হাজার টাকা খরচ করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া, অর্গানিক বা ফ্রি মার্কেটিং দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব কীভাবে আপনি কোনো টাকা খরচ না করেই সঠিক কৌশলে ফেসবুকে আপনার পণ্য বা সেবার মার্কেটিং করতে পারেন।
সহজ কথায়, ফেসবুকে কোনো প্রকার বুস্টিং বা বিজ্ঞাপনের টাকা খরচ না করে স্বাভাবিক উপায়ে পোস্ট, শেয়ার এবং এনগেজমেন্টের মাধ্যমে যে প্রচার চালানো হয়, তাকেই অর্গানিক বা ফ্রি মার্কেটিং বলে। এটি সময়সাপেক্ষ হলেও, এর মাধ্যমে গড়ে ওঠা গ্রাহক ভিত্তি অনেক বেশি বিশ্বস্ত হয়।
নিচে ফ্রি মার্কেটিংয়ের কার্যকরী ধাপগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
মার্কেটিংয়ের প্রথম ধাপ হলো আপনার "দোকান" বা পেজটি সাজানো। একটি অগোছালো পেজ দেখলে কাস্টমার কখনোই ভরসা পাবে না।
নাম ও ইউজার নেম: পেজের নাম সহজ এবং ব্যবসার সাথে প্রাসঙ্গিক রাখুন। পেজ খোলার পরপরই একটি ইউনিক Username (যেমন: @MyBusinessBD) সেট করুন, যাতে সার্চ দিলে সহজেই খুঁজে পাওয়া যায়।
প্রোফাইল ও কভার ফটো: লোগো এবং কভার ফটো অবশ্যই উচ্চমানের হতে হবে। কভার ফটোতে আপনার বর্তমান অফার বা ব্যবসার মূল স্লোগান লিখে দিতে পারেন।
অ্যাবাউট সেকশন (About Section): আপনার ব্যবসা কী নিয়ে, আপনারা কী সমাধান দিচ্ছেন এবং আপনাদের সাথে যোগাযোগের উপায়—সবকিছু বিস্তারিত লিখুন।
কল টু অ্যাকশন (CTA) বাটন: পেজের শুরুতে ‘Send Message’, ‘Call Now’ বা ‘Visit Website’ বাটনটি সেট করুন। এটি কাস্টমারকে আপনার সাথে যোগাযোগ করতে উৎসাহিত করে।
ফ্রি মার্কেটিংয়ের প্রাণ হলো কন্টেন্ট। আপনি টাকা দিচ্ছেন না, তাই আপনাকে মেধা ও সময় দিতে হবে। কন্টেন্ট ভালো না হলে রিচ (Reach) বাড়বে না।
কী ধরনের কন্টেন্ট তৈরি করবেন?
শিক্ষামূলক পোস্ট: সরাসরি পণ্য বিক্রির কথা না বলে, পণ্যটি কীভাবে মানুষের উপকারে আসবে তা নিয়ে লিখুন। যেমন: আপনি যদি শ্যাম্পু বিক্রি করেন, তবে "চুল পড়ার ৫টি কারণ ও প্রতিকার" নিয়ে একটি ব্লগ বা ভিডিও পোস্ট করুন।
ভিজুয়্যাল কন্টেন্ট: মানুষ পড়ার চেয়ে দেখতে বেশি পছন্দ করে। ঝকঝকে ছবি, ইনফোগ্রাফিক্স এবং ছোট ভিডিও তৈরি করুন। এর জন্য Canva এর মতো ফ্রি টুল ব্যবহার করতে পারেন।
ফেসবুক রিলস (Reels): বর্তমানে ফেসবুকে অর্গানিক রিচ পাওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো 'রিলস'। ১০-৩০ সেকেন্ডের ছোট ভিডিওর মাধ্যমে আপনার পণ্যের ব্যবহার বা বিহাইন্ড দ্য সিন (Behind the scene) দেখান। ফেসবুক এখন রিলসকে সাধারণ ভিডিওর চেয়ে অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করে।
লাইভ সেশন: সপ্তাহে অন্তত একদিন পেজ থেকে লাইভে আসুন। কাস্টমারদের প্রশ্নের উত্তর দিন, নতুন পণ্য দেখান। লাইভ ভিডিও ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি এনগেজমেন্ট তৈরি করে।
টিপস: ৮০/২০ নিয়ম মেনে চলুন। অর্থাৎ, আপনার ৮০% পোস্ট হবে তথ্যমূলক বা বিনোদনধর্মী, আর মাত্র ২০% পোস্ট হবে সরাসরি বিক্রির জন্য। এতে মানুষ বিরক্ত হবে না।
ফ্রি মার্কেটিংয়ের জন্য ফেসবুক গ্রুপ হলো সোনার খনি। পেজের রিচ কমে গেলেও গ্রুপের রিচ সাধারণত বেশি থাকে।
নিজেস্ব কমিউনিটি গ্রুপ: আপনার পেজের নামে একটি গ্রুপ খুলুন। সেখানে কাস্টমারদের রিভিউ শেয়ার করতে বলুন, তাদের সমস্যার সমাধান দিন। এটি একটি বিশ্বস্ত কমিউনিটি তৈরি করবে।
অন্য গ্রুপে অ্যাক্টিভিটি: আপনার ব্যবসার সাথে সম্পর্কিত বড় বড় গ্রুপগুলোতে জয়েন করুন। সেখানে সরাসরি বিক্রির পোস্ট না দিয়ে, মানুষের প্রশ্নের উত্তর দিন বা পরামর্শ দিন। যখন আপনি নিজেকে একজন এক্সপার্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবেন, মানুষ আপনার প্রোফাইল বা পেজ ভিজিট করবে।
স্প্যামিং থেকে বিরত থাকুন: অন্যের গ্রুপে গিয়ে কমেন্টে নিজের পেজের লিংক শেয়ার করবেন না। এতে আপনার এবং আপনার ব্র্যান্ডের সুনাম নষ্ট হয় এবং গ্রুপ থেকে ব্যান হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ফেসবুকের অ্যালগরিদম বা নিয়ম হলো—যে পেজে মানুষ বেশি কথা বলে বা প্রতিক্রিয়া দেখায়, সেই পেজকে ফেসবুক অন্যদের নিউজফিডে বেশি দেখায়।
দ্রুত রিপ্লাই: মেসেজ বা কমেন্টের উত্তর যত দ্রুত সম্ভব দিন।
প্রশ্ন করুন: পোস্টের ক্যাপশনে কাস্টমারদের কাছে প্রশ্ন রাখুন। যেমন—"আপনারা কোন রঙটি বেশি পছন্দ করেন? লাল নাকি নীল?" এতে কমেন্ট বাড়বে।
মতামতকে গুরুত্ব দিন: নেতিবাচক কমেন্ট এলেও রেগে না গিয়ে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বলুন। আপনার ভদ্রতা অন্য কাস্টমারদের কাছে আপনার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে।
ফ্রি মার্কেটিংয়ে সফল হওয়ার মূল চাবিকাঠি হলো ধৈর্য এবং ধারাবাহিকতা। আজ একটি পোস্ট দিলেন, আবার ১০ দিন পর খবর নেই—এভাবে মার্কেটিং হবে না।
কন্টেন্ট ক্যালেন্ডার: মাসের শুরুতেই ঠিক করে ফেলুন কবে কী পোস্ট করবেন।
সঠিক সময় নির্বাচন: আপনার পেজের Insights অপশনে গিয়ে দেখুন আপনার অডিয়েন্স দিনের কোন সময়ে বেশি অনলাইনে থাকে। ঠিক সেই সময়ে পোস্ট করুন। সাধারণত বাংলাদেশে সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ইউজাররা বেশি সক্রিয় থাকে।
ফেসবুক এখন গুগলের মতোই একটি সার্চ ইঞ্জিনে পরিণত হচ্ছে। তাই আপনার পেজ এবং পোস্টগুলোকে এসইও (SEO) ফ্রেন্ডলি করা জরুরি।
কি-ওয়ার্ড ব্যবহার: আপনার ব্যবসার সাথে সম্পর্কিত শব্দগুলো (Keywords) পেজের ডেসক্রিপশনে, পোস্টের ক্যাপশনে এবং হ্যাশট্যাগে ব্যবহার করুন। যেমন: আপনি যদি শাড়ি বিক্রি করেন, তবে #JamdaniSaree #HandloomBD ইত্যাদি হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করুন।
অল্ট টেক্সট (Alt Text): ছবি আপলোড করার সময় ছবির এডিট অপশন থেকে অল্ট টেক্সট যোগ করুন। এতে কেউ গুগলে বা ফেসবুকে সার্চ দিলে আপনার ছবি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
মানুষ পণ্য কেনে না, মানুষ আবেগ কেনে। আপনার পণ্যের পেছনের গল্পটি বলুন।
আপনি কীভাবে ব্যবসা শুরু করলেন?
এই পণ্যটি তৈরি করতে কতটা পরিশ্রম হয়েছে?
একজন কাস্টমার আপনার পণ্য ব্যবহার করে কীভাবে উপকৃত হয়েছেন?
এই ধরনের গল্প মানুষকে আপনার ব্র্যান্ডের সাথে মানসিকভাবে যুক্ত করে। একে বলা হয় "ইমোশনাল মার্কেটিং"।
ফ্রি মার্কেটিং মানে অন্ধের মতো পোস্ট করা নয়। ফেসবুকের Meta Business Suite বা Professional Dashboard থেকে নিয়মিত চেক করুন:
কোন ধরনের পোস্টে রিচ বেশি হচ্ছে?
ভিডিও ভালো চলছে নাকি ছবি?
কোন বয়সের মানুষ আপনার পেজ বেশি দেখছে?
এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আপনার পরবর্তী কন্টেন্ট পরিকল্পনা সাজান। যেটা কাজ করছে, সেটা বেশি বেশি করুন।
টাকা খরচ না করেও আপনি অন্য পেজের সাথে মিলে মার্কেটিং করতে পারেন। একে ক্রস-প্রমোশন (Cross-Promotion) বলে।
ধরুন আপনি গয়না বিক্রি করেন। আপনি এমন কারো সাথে পার্টনারশিপ করতে পারেন যিনি শাড়ি বিক্রি করেন। আপনারা একে অপরের পেজ মেনশন করে পোস্ট দিতে পারেন। এতে উভয়ের ফলোয়াররা নতুন পেজ সম্পর্কে জানতে পারবে।
টাকা খরচ ছাড়া ফেসবুকে মার্কেটিং করা বা অর্গানিক গ্রোথ আনা একদিনের বিষয় নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। পেইড মার্কেটিং আপনাকে দ্রুত সেল এনে দিতে পারে, কিন্তু অর্গানিক মার্কেটিং আপনাকে একটি শক্তিশালী "ব্র্যান্ড" হিসেবে গড়ে তুলবে।
সঠিক পরিকল্পনা, মানসম্মত কন্টেন্ট, নিয়মিত উপস্থিতি এবং কাস্টমারদের সাথে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখলে, আপনি বিনা খরচেই ফেসবুকে আপনার ব্যবসাকে অনেক দূর নিয়ে যেতে পারবেন। মনে রাখবেন, ফেসবুকে সফল হওয়ার জন্য টাকার চেয়েও বড় পুঁজি হলো— ক্রিয়েটিভিটি বা সৃজনশীলতা।
Comments
Post a Comment